বিশ্ব হস্পিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবস ২০২৬: বিশ্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিত এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার গ্লোবাল অ্যাটাসের সারসংক্ষেপ
ভূমিকা
প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শনিবার পালিত হয় বিশ্ব হস্পিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবস। এই বিশেষ দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ওয়ার্ল্ড হস্পিস অ্যান্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যালায়েন্স (WHPCA) যৌথভাবে প্রকাশ করেছে বহুল প্রতীক্ষিত **গ্লোবাল অ্যাটাস অব প্যালিয়েটিভ কেয়ার (তৃতীয় সংস্করণ, ২০২৬)**। এই প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে গুরুতর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যন্ত্রণায় (Serious Health-related Suffering – SHS) ভোগা মানুষ এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমমূলক সেবার বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
১. বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও প্রয়োজনের চিত্র (গ্লোবাল অ্যাটাস ২০২৬)
- মোট রোগীর সংখ্যা: বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৭ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষ (প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু মিলিয়ে) গুরুতর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যন্ত্রণায় ভোগেন এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা উপশমের সেবা প্রয়োজন হয়।
- অমরৃত্যু রোগী (Non-decedents): এই বিশাল সংখ্যার ৬২.৪% (প্রায় ৪ কোটি ৫৯ লক্ষ মানুষ) হলেন এমন রোগী, যাদের জীবনের শেষ বছর নয়, বরং তার অনেক আগে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রয়োজন হয়।
- প্রধান রোগসমূহ: প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ৭৩.৬% প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় অসংক্রামক রোগ (NCDs) থেকে—যার মধ্যে ক্যানসার (২৭.৯%), এইচআইভি/এইডস (১৮.৭%), মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক (১৩.২%) এবং ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ (১২.৩%) প্রধান।
- শিশুদের প্যালিয়েটিভ কেয়ার: বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৬ লক্ষ শিশু (মোট প্রয়োজনের ১৪.৪%) এই সেবার আওতাভুক্ত। এর মধ্যে ৯৬.২% শিশু বাস করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে (LMICs)। শিশুদের ক্ষেত্রে মূলত জন্মগত ত্রুটি, বিপাকীয় রোগ (EMBID) এবং প্রিম্যাচিউর জন্মজনিত জটিলতা এর প্রধান কারণ।
২. প্রধান চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রসারে বিশ্বজুড়ে মূলত ৬টি প্রধান বাধার সম্মুখীন হতে হয়:
- নীতিমালা (Policy): বহু দেশে এখনো জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়নি।
- দক্ষ জনবল ও শিক্ষা (Education): চিকিৎসাবিদ্যা ও নার্সিং শিক্ষায় এই বিষয়ের পর্যাপ্ত অন্তর্ভুক্তি না থাকায় বিশ্বজুড়ে অন্তত ২১ লক্ষ অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে।
- ওষুধের লভ্যতা (Medication): ব্যথানাশক অপরিহার্য নিয়ন্ত্রিত ওষুধ—বিশেষ করে মুখে খাওয়ার মরফিনের অপ্রতুলতা একটি বড় সংকট। বিশ্বের প্রায় ৮০% মানুষের কাছে ব্যথানাশক মরফিনের সঠিক লভ্যতা নেই।
- সামাজিক অংশগ্রহণ ও গবেষণা: মুমূর্ষু রোগীদের সেবায় পরিবারগুলো প্রায় ৮০-৯০% দীর্ঘমেয়াদী সেবা দিয়ে থাকে, ফলে তাদের মানসিক ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের (SEARO) চিত্র
- আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্কদের প্যালিয়েটিভ কেয়ার চাহিদার ১৪.৭% এবং শিশুদের চাহিদার ১৮.১% বহন করে।
- বাংলাদেশে সেবার বিকাশ: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং বেসরকারি উদ্যোগের (এনজিও) মাধ্যমে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেবা সীমিত আকারে চালু থাকলেও, বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এটিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (PHC) এবং কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
- চ্যালেঞ্জসমূহ: সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে ব্যথানাশক মরফিন পৌঁছে দেওয়া, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অন্তর্ভুক্তি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
৪. ভবিষ্যৎ করণীয় ও ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (UHC)
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG ৩.৮) অনুযায়ী, প্যালিয়েটিভ কেয়ার ছাড়া সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ অসম্পূর্ণ। ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক প্রতিবেদনে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে:
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে (Primary Care) প্যালিয়েটিভ কেয়ারকে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা
সাশ্রয়ী মূল্যে অপরিহার্য ওষুধ ও মরফিন সহজলভ্য করার জন্য জাতীয় নীতিমালায় পরিবর্তন আনা।
পারিবারিক সেবাদানকারীদের (Caregivers) জন্য মানসিক ও সামাজিক সহায়তা জোরদার করা।
বিশ্ব হস্পিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবস ২০২৬-এর এই দিনে আসুন আমরা নিশ্চিত করি যে, জীবনের শেষ পর্যায়ে বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় কেউ যেন অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণার শিকার না হয় এবং প্রতিটি মানুষ যেন সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার পায়।





Leave a Reply
Want to join the discussion?Feel free to contribute!